রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২১ ইং, বাংলা ১৬, ফাল্গুন ১৪২৭
  • ঢাকা টাইমস নিউজ ডেস্ক
  • ১৫৯৫৯১৫৫০৪

দেশজুড়ে জঙ্গি হামলার শঙ্কা

দেশজুড়ে জঙ্গি হামলার শঙ্কা

রোববার রাতে ঢাকা জেলার ধামরাই এলাকা থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের ৫ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব

ঢাকাসহ সারা’দেশে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামার চেষ্টা করছে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) দুর্ধর্ষ জঙ্গিরা। তারা মূলত: করেছে টার্গেট পুলিশের কোন টিম, স্থাপনা বা যান-বাহনকে। এছাড়াও বিমান-বন্দর, দূতাবাস, বিশেষব্যক্তি, মাজার’কেন্দ্রিক মসজিদ, চার্চ ও মন্দির-সহ যেকোনো ধর্মীয় উপাসনালয় গুলোও তাদের মূল হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্য’বস্তু হতে পারে। গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে এমন তথ্য-পাওয়ার পর র‌্যাব-পুলিশ’সহ আইন-শৃঙ্খলা-রক্ষাকারী বাহিনী দেশব্যাপী সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে।

এরমধ্যেই এ বিষয় নিয়ে দেশের সব ইউনিটে চিঠি পাঠিয়েছে পুলিশের সদরদপ্তর থেকে। সদরদপ্তরের এআইজি (অপারেশনস-১) সাইদ তারিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এ চিঠিটি আরও তিনদিন আগে ইস্যু করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে নিশ্চিত করেছে।

ওই চিঠিতে বলা হয়, গোয়েন্দা তথ্য পর্যালোচনা করে জেনেছে, তথা’কথিত আইএস আসন্ন ঈদুল আজহা সামনে রেখে কথিত 'বেঙ্গল উলায়াত' ঘোষণার উদ্যোগ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ঘটনা প্রবাহ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সাধারণত বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলার মাধ্যমেই 'বেঙ্গল উলায়াত' ঘোষণা করা হয়। এ অবস্থায় আইএসের দেশীয় অনুসারী নব্য জেএমবির সদস্যরা হামলা পরিচালনাসহ যেকোনো জঙ্গি হামলা বা বোমা হামলার মাধ্যমে হত্যাকান্ড সংঘটনসহ নাশকতামূলক কর্মকান্ড করতে পারে। তাই পুলিশের সব ইউনিটকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে যথাযথ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

হামলার সময় কী ধরনের অস্ত্র থাকতে পারে সে বিষয়েও পুলিশের গোপন চিঠিতে উলেস্নখ করা হয়েছে। এসব তথ্যের নিরিখে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটসহ জঙ্গিসংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। এছাড়া উগ্রপন্থি বা তাদের সংগঠনের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি, পুলিশের সবাইকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বজায় রাখা, পুলিশের গাড়ি-স্থাপনা খালি বা পরিত্যক্তভাবে ফেলে না রাখা, পুলিশের ভবনগুলোতে প্রবেশের সময় নিরাপত্তা ও পরিচয় নিশ্চিত করা, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি করা, চেকপোস্টে তলস্নাশি বাড়ানো, সন্দেহ হলে ব্যাগ-দেহ তলস্নাশি করা, সন্দেহজনক এলাকায় বস্নক রেইড করতে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানায়, দিন-তারিখ না উলেস্নখ থাকলেও চিঠিতে হামলার সময়কাল ধরা হয়েছে, সকাল ৬-৭টা অথবা সন্ধ্যা ৭-১০টা। হামলাকারীদের বয়স ১৫-৩০ বছরের মধ্যে হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চিঠিতে সবশেষে উলেস্নখ করা হয়, সব ইউনিটপ্রধান যেন এসব নির্দেশনা গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করেন। এদিকে উগ্রপন্থিদের কার্যক্রম নিয়ে রোববার বিকাল ৩টায় নিজ কার্যালয়ে এক সভা ডাকেন ডিএমপি কমিশনার শফিকুল ইসলাম। সেখানে তিনি সব কর্মকর্তাকে এসব বিষয়ে নির্দেশনা দেন। এ সভার সত্যতা ডিএমপির বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্বীকার করেন।

এদিকে বিষয়টি নিশ্চিত করে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, দেশে জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দুর্বল। ঈদের আগে তারা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে পারে; কিন্তু বড় ধরনের হামলার সক্ষমতা তাদের নেই। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। তিনি আরও বলেন, এসব উৎসবের সময়ে জঙ্গিরা আগ্রাসী হয়ে ওঠে। তাই আমরা বাড়তি সতর্কতা নিয়ে রাখছি।

এদিকে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারের উপ-কমিশনার ওয়ালিদ হোসেন বলেন, আমরা অনেক আগে থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছি। ঈদ বা জাতীয় দিবসগুলোকে ঘিরে জঙ্গিরা সব সময় টার্গেট করে থাকে। এ নিয়ে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য ইউনিট কাজ করছে। এরই মধ্যে জনসমাগম এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। ঈদের জামাত থেকে যাতে কোনো ধরনের নাশকতা না হয় সে বিষয়টিও খেয়াল রাখা হচ্ছে। মসজিদ, মন্দির, গির্জায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা নেওয়া হয়েছে। কাদিয়ানী ও শিয়া সম্প্রদায়ের উপাসনালয়গুলোতেও নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, করোনা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েই হয়তো বোমা বিস্ফোরণসহ কোনো হামলা কিংবা অন্য কোনো অপকৌশলে আতঙ্কে ছড়িয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার টার্গেট নিয়ে মাঠে নামছে জঙ্গিরা। আর এরই প্রাইমারি ট্রায়াল হিসেবে তারা বেশ কিছু ছোটখাটো ঘটনা ঘটিয়ে নিজেদের জানান দিচ্ছে।

প্রসঙ্গত, রাজধানীর পল্টনে গত শুক্রবার রাতে পুলিশ চেকপোস্টের খুব কাছেই রহস্যজনক বোমা বিস্ফোরণের পর ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই গুলিস্তানে বঙ্গবন্ধু স্কয়ারে গ্রেনেডের মতো বস্তু উদ্ধার করা হয়।

যদিও জঙ্গি নিয়ে কাজ করা ঊর্ধ্বতন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ধারণা, বড় ধরনের কোনো হামলা চালানোর শক্তি-সামর্থ্য ষড়যন্ত্রকারী চক্রের নেই। এ কারণেই হয়তো তারা পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তাদের মূল টার্গেট হিসেবে নেওয়ার চেষ্টা করছে। কেননা পুলিশের ওপর ছোট ধরনের হামলা চালাতে পারলেই তাতে দেশে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হবে। এতে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্রম্নত ভীতি ছড়াবে। একই ফন্দিতে তারা মসজিদ, মাজার, গির্জা ও মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপসনালয়েও হামলা চালানোর টার্গেট নিতে পারে বলে মনে করেন গোয়েন্দারা।

এদিকে বোমা হামলার পাশাপাশি ভিন্ন অপকৌশলে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার টার্গেটে কোনো উগ্রপন্থি গোষ্ঠী মাঠে নেমেছে, নাকি এর নেপথ্যে রাজনৈতিক সন্ত্রাসীরা রয়েছে তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। পাশাপাশি শুক্রবার রাতে পল্টনে কে বা কারা বোমা বিস্ফোরণ ঘটাল এবং গুলিস্তানের বঙ্গবন্ধু স্কয়ারে কীভাবে গ্রেনেডের মতো বস্তু ফেলে রাখল তা অনুসন্ধানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জোরাল তৎপরতা চালাচ্ছে।

তদন্তের সঙ্গে যুক্ত গোয়েন্দারা জানান, দুটি ঘটনায় কারা, কীভাবে অংশ নিয়েছিল তা এখনো নিশ্চিত হওয়া না গেলেও মূলত আতঙ্ক সৃষ্টিই তাদের মূল লক্ষ্য ছিল তা অনেকটাই নিশ্চিত হওয়া গেছে। কেননা পল্টনে যেখানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে ওই সময় ঘটনাস্থলটি ছিল পুরোপুরি জনশূন্য। এছাড়া গুলিস্তানে উদ্ধারকৃত গ্রেনেড সদস্য বস্তুটি ছিল স্রেফ বালুভর্তি একটি আধাকাটা কোকের বোতল। তবে এর নেপথ্যে ভিন্ন কোনো লক্ষ্য ছিল কি না তাও গভীরভাবে অনুসন্ধান করা হচ্ছে। শিগগিরই তারা আসল রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের দায়িত্বশীল ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, মাত্র ৫ মাস আগে চট্টগ্রামের একটি পুলিশ বক্সে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে নগর ট্রাফিক পুলিশের এক সার্জেন্টসহ পাঁচজন আহত হন। বিস্ফোরণের পরদিন হামলার দায় স্বীকার করে ইসলামিক স্টেট (আইএস) বার্তা দেয়। এর আগে গত বছরের এপ্রিল, মে ও আগস্টে ঢাকা মহানগরীতে পুলিশের ওপর তিনটি হামলার ঘটনা ঘটে। তাই গত শুক্র ও শনিবার ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে পল্টন ও গুলিস্তানের ঘটনার সঙ্গে যেকোনো জঙ্গিগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা নেই তারা তার নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না। বিশেষ করে পল্টনে পুলিশ বক্সের মাত্র দুইশ গজ দূরে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনার সঙ্গে চট্টগ্রামে পুলিশ বক্সে বোমা হামলার কোনো যোগসূত্র আছে কি না তা তাদের ভাবিয়ে তুলেছে।

ডিএমপি সূত্র জানায়, পল্টন ও গুলিস্তানের ঘটনা দুটি ছোট হলেও তারা তা যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। রোববার এ নিয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। ঈদের ছুটি এবং পরবর্তী সময়ে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কতটা সতর্ক থেকে কীভাবে দায়িত্ব পালন করবে এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কীভাবে তা মনিটর করবেন সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, পল্টনে বোমা বিস্ফোরণ এবং গুলিস্তানে গ্রেনেডের মতো বস্তু ফেলে রেখে আতঙ্ক সৃষ্টির নেপথ্যে উগ্রপন্থি না কি রাজনৈতিক সন্ত্রাসীরা জড়িত তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ঘটনা যেটাই ঘটুক না কেন পুলিশকে আরও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, পুলিশকে টার্গেট করে এই ছোটখাটো হামলা অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য হতে পারে। হলি আর্টিজানের পর ব্যাপক জঙ্গিবিরোধী অভিযানে তারা দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই করোনা ও বন্যার নাজুক পরিস্থিতিতে তারা হয়তো মাথাচাড়া দিতে চাচ্ছে। আর এরই প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে তারা হয়তো এখন ড্রেস রিহার্সাল দিচ্ছে।

তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা কেউ কেউ মনে করেন, এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে নৈরাজ্য সৃষ্টির টার্গেট থাকলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যকে হত্যার পরিকল্পনা হয়তো তাদের নেই। এ ব্যাপারে যৌক্তিকতা তুলে ধরে তারা বলেন, এর আগে গুলিস্তানে ট্রাফিক বক্স ও মালিবাগের বিস্ফোরণের ঘটনায় চারজন পুলিশ কনস্টেবলসহ পাঁচজন আহত হয়েছিলেন। সায়েন্স ল্যাব মোড়ে হামলায় আহত হয়েছে দুই পুলিশ সদস্য। তবে কেউ গুরুতর আহত হননি। হামলাকারীরা কিলিং টার্গেট করে থাকলে তারা আরও শক্তিশালী বোমার বিস্ফোরণ ঘটাতে পারত। এছাড়া নির্জন কোনো স্থানে টহলরত পুলিশের ওপর হামলা চালাত।

তারা আরও মনে করেন, এসব ঘটনার সঙ্গে আন্তর্জাতিক কোনো জঙ্গি সংগঠনের মঙ্গে জড়িত থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। কেননা আন্তর্জাতিক জঙ্গিরা আতঙ্ক সৃষ্টির চেয়ে বড় ধরনের হত্যাযজ্ঞ চালানোর ব্যাপারেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তাদের বিগত সময়ের হামলার পর্যালোচনায় সে তথ্যই পাওয়া গেছে। তাই এসব ঘটনায় রাজনৈতিক সন্ত্রাসীরা জড়িত রয়েছে কি না তা-ও খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মন্তব্য করেন বিশ্লেষকরা।

ট্যাগস:

জঙ্গিহামলা

এ জাতীয় আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়